আমার জীবনের বেশিরভাগ পহেলা বৈশাখ কাটিয়েছি বাসায় বসে। বৈশাখের অনুষ্ঠান বলতে টিভি কিংবা সংবাদপত্রে দেখা পর্যন্ত। পহেলা বৈশাখ সাধারণত আমার কাছে একটি সরকারী ছুটির দিন ছাড়া আর কিছু ছিল না – বড়জোর “বাঙালির প্রাণের উৎসব”, “ঐতিহ্য স্মরণের দিন”-ব্যস এই পর্যন্তই।
কিন্তু ১৪১৮ বঙ্গাব্দের শুরুটা হলো একটু ভিন্নভাবে। এবারে শুরুটা করেছি এক উৎসব দিয়ে – আমার উৎসব দিয়ে, আমাদের উৎসব দিয়ে। আপনারা যারা জানেন রঙ পেন্সিল একাডেমির সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত, তারা হয়তো জানেন যে এই একাডেমি এবার ছয় ফুট উচ্চতার একটি মোরগের সাথে বৈশাখকে উদযাপন করেছে – যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে থাকে। বাশ, চটি আর সংবাদপত্রের কাগজ দিয়ে তৈরি হয়েছে এই মোরগটি। এটি তৈরি করেছেন আমাদের একাডেমির অন্যতম প্রিয় ব্যক্তিত্ব – শিবলুদা (অঙ্কন কুমার শিবলু)। তিনিই পুরো আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন – মুখোশ তৈরি থেকে শুরু করে মঞ্চ তৈরি, পারফরমারদের পারফরম্যান্স পরীক্ষা – সবকিছু।
একাডেমি এবারের বৈশাখে একটি র্যালী / শোভাযাত্রা বের করেছিল – যেটি যাত্রাবাড়ি এবং এর আশাপাশের এলাকা ঘুরে বেরিয়েছে। আর সঙ্গে ছিল বিশাল মোরগ, রঙ বেরঙ্গের মুখোশ আর বাচ্চাদের বর্ণিল মন। র্যালির সামনে ছিল ঢাক ঢোল পেটানো একটি দল। র্যালির সামনে কয়েকজন উৎফুল্ল অংশগ্রহণকারী মনের আনন্দে নেচে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন তারা শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত নেচেই যাবে। এক কথায় এক উৎফুল্ল উৎসবের আমেজ। (এধরণের র্যালী যাত্রাবাড়িতে এই প্রথম।)
আমরা পুরো অনুষ্ঠানটি একটি রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে করেছিলাম। একাডেমির সামনের রাস্তাটি থানা থেকে অনুমতি নিয়ে আমরা ব্লক করে সেখানে স্টেজ তৈরি করেছিলাম। স্টেজটি একরাতের মধ্যে তৈরি করতে হয়েছে, কারণ রাস্তাটি শুধু ২৪ ঘন্টার জন্য আমরা পেয়েছিলাম (শিবলুদা আর তার টিম সারা রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন স্টেজটি তৈরির জন্য)। প্রথমে একটি সূচনা অনুষ্ঠান তারপর র্যালী আর র্যালীর পর আমাদের একাডেমির শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অংশগ্রহণে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান – এই ছিল বলতে গেলে আমাদের পরিকল্পনা।
আর পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলাম দুজনে – আমি আর রুমি। আমরা দুজনে ছিলাম উপস্থাপক-উপস্থাপিকা।
আচ্ছা, আমি তাহলে এবার একেবারে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি। অর্থাৎ পুরো দিনটির একটি বর্ণনা।
সকালে ঘুম থেকে উঠলাম সাড়ে পাঁচটায়। উঠে নামাজ পড়ে তারপর গোসল করলাম। বের হতেই শিবলুদার ফোন। উনি এক অদ্ভুত কথা শোনালেন। স্টেজ নাকি যেরকম পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেরকম হয় নি। আমাদেরকে নাকি মাটিতে বসেও উপস্থাপনা করতে হতে পারে! আমি একটু অবাক হলাম, ভাবলাম শিবলুদা মজা করছে (উনি বেশ মজার মানুষ তো)। কিন্তু গলায় আবার সিরিয়াস ভাব। একটু সন্দিহান হয়ে আমি রুমিকে ফোন দিলাম এবং বললাম স্টেজের কথা, জিজ্ঞেস করলাম তাকে কি শিবলুদা ফোন দিয়েছিল কিনা – না দেন নি। রুমি শিবলুদাকে ফোন দিবে বলে আমাদের কথা শেষ হল।
আব্বার গিফট করা পাঞ্জাবিটা পড়ে আমি সাড়ে ছয়টা নাগাদ রওনা দিলাম। সাতটায় প্রোগ্রাম শুরু হবার কথা – তাই আধঘন্টা হাতে রাখার চেষ্টা আরকি।
গিয়ে দেখি শিবলুদা আর তার টিম উদাস মনে বসে আছেন। আমি যেতেই বললেন, “আরে আর বইলেন না, স্টেজ আরেকটু হলে নিয়াই গেছিলো। সকাল বেলা একটা সিটি করপোরেশনের গাড়ি আইসা স্টেজটা ব্রিজ পর্যন্ত নিয়া গেছিলো। পরে আমরা আটকাইয়া বকাঝকা দিয়া স্টেজ নিয়া আসছি।” দিনটাই শুরু হলো একটা খারাপ খবর দিয়ে। যাই হোক, একাডেমির অফিস রুমে গিয়ে বসলাম।
৭টা বেজে গেল – তবুও অনুষ্ঠান শুরুর নাম নেই। কারণ সাউন্ড সিস্টেম এখনো পৌছে নি। প্রায় আটটা নাগাদ রুমি এসে পৌছলো। তাকে চেনাই যাচ্ছিল না। ক্লাসিক স্টাইলের মেকাপ দিয়ে এসেছে সে। আর তার ইয়া লম্বা চুলের বেনী দেখে তো আমার ভিড়মি খাওয়ার যোগার – রুমি আবার এত সুকেশী কি করে হলো?! যাই হোক, পুরোনো আমলের নায়িকার মত সাজে তাকে অন্যরকম লাগছিল।
শেষমেশ নয়টার সময় সাউন্ড সিস্টেম এলো। কিন্তু সমস্যা হলো কারেন্টের লাইন দিতে গিয়ে। লাইন পাওয়া যাচ্ছিল না। আর যেটাও পাওয়া গেল সেটার জন্য অনুমতি পাওয়া গেল না। পরে সাড়ে নয়টার সময় সাউন্ড সিস্টেম রেডি হলো, আমি আর রুমি চলে এলাম স্টেজে। দেখলাম এর মধ্যেই বেশ জনসমাগম হয়েছে। আমি আর রুমি বৈশাখীর আগের দিন রাত এগারোটায় বাসায় ফিরেছিলাম, একাডেমিতে বসে বসে উপস্থাপনার স্ক্রিপ্ট রেডি করেছিলাম। স্ক্রিপ্টটা খুবই ভাল হয়েছিলো। সেই স্ক্রিপ্টটা ধরে মাত্র অনুষ্ঠান শুরু করতে যাবো – এমন সময় আমাদের প্রধান অতিথি আলহাজ্ব হাবিবুর রহমান মোল্লা (এমপি) এসে উপস্থিত হলেন। তাই কোনোরকম সূচনা ছাড়াই অনুষ্ঠান শুরু করে দিতে হলো – “সুপ্রিয় দর্শক-শ্রোতা, আমাদের মাঝে এখন উপস্থিত হয়েছেন আমাদের আজকের আয়োজনের প্রধান অতিথি… আসুন আমরা করতালির মাধ্যমে তাকে …।” স্ক্রিপ্টটা মাঠে মারা গেল। যাই হোক প্রধান অতিথি ও সভাপতির ভাষণ দিয়ে আপাতত সূচনা অনুষ্ঠান শেষ করা হল। আর তাছাড়া এমপিকে একটা দলীয় সঙ্গীত শোনানো হল – “এসো হে বৈশাখ”।
অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরী হয়েছে বলে রঙ পেন্সিলের পরিচালক জীবন (যে আমার বন্ধু) আমার কানে এসে বললো “র্যালী শুরু করে দাও, লোকজন অধৈর্য্য হয়ে পড়বে।” র্যালীটি শুরু করে দেয়া হল। আর এই অবস্থায় কিন্তু কোনো স্ক্রিপ্ট নেই। নিজে থেকে বুদ্ধি করে দুজনে মিলে বিভিন্ন কথা বলে চালিয়ে গেলাম – একাডেমির কথা, আয়োজনের কথা, স্টেজের কথা ইত্যাদি। র্যালীটি চলে যাবার পরও আমরা দেখলাম কিছু লোক মঞ্চের সামনে জড়ো হয়ে আছে। তাদেরকে ধরে রাখার জন্য আমরা আরো কিছুক্ষণ স্ক্রিপ্ট ছাড়া উপস্থাপনা চালিয়ে গেলাম। এই অংশটি আমার খুব ভাল লেগেছে – কারণ আমি স্ক্রিপ্ট ছাড়া খুব ভাল বলতে পারি, কিন্তু ধরাবাধা স্ক্রিপ্ট দিয়ে দিলে একটু কেমন যেন লাগে! আর এক্ষেত্রে রুমির প্রশংসা করতে হয় – কারণ ওর স্মার্টনেসের কারণে আমাদের উপস্থাপনা ভালো হয়েছিল।
আমরা আধঘন্টার মত এভাবে চালালাম। মাঝে দিয়ে রুমি আবার ফোন করে জেনে নিয়েছিল র্যালীটি কোথায় আছে (ঐ যে বললাম – রুমির স্মার্টনেস)। তাই আমরা জানিয়ে দিতে পেরেছিলাম “আগ্রহী দর্শক-শ্রোতা, এখন আমাদের র্যালীটি বিবির বাগিচা ২ নম্বর গেটে অবস্থান করছে। আপনারা যারা র্যালীটিতে অংশগ্রহণ করতে চান তারা এখনও এতে যোগ দিতে পারেন।” এরমধ্যে আবার রুমির এক বান্ধবীও এসে উপস্থিত হল। উপস্থাপনার ফাঁকে শান্তার সঙ্গে পরিচিত হলাম।
আমরা একসময় দেখলাম আর চালানো যাচ্ছে না। পরে অফিসে চলে গেলাম। এরমধ্যে বাংলা কিছু গান বাজতে থাকলো।
আমরা বসে বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্টটা রিভাইস করছিলাম। শান্তাও ছিল তখন আমাদের সাথে – চুপচাপ বসে বসে দেখছিল আমরা কি করি। তাকে দেখে আমি আর রুমি মুচকি হাসলাম – কারণ ওতো জানে না আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্টে কি মজা রেখেছি! (আমরা এগারোটা পর্যন্ত একাডেমিতে বসে বসে অনেক মজার একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছি – বকাও খেয়েছি – পরে আরো বলছি…)
এই সেই করতে করতে একসময় খবর পেলাম র্যালীটি কাছাকাছি চলে এসেছে। তখন তড়িঘড়ি করে আমরা আবার স্টেজে চলে এলাম। তারপর আবার স্ক্রিপ্ট ছাড়া কথা বলা – “দর্শক-শ্রোতা, আপনারা নিশ্চয় আমাদের র্যালীর ঢাকঢোলের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন? আমাদের র্যালীটি এখন কাছাকাছি চলে এসেছে।”…”যারা র্যালীতে যোগ দিতে পারেননি তাদের এখনই সুযোগ এই ঐতিহাসিক র্যালীতে যোগ দেয়ার!” … “আপনারা তো জানেনই এই ধরণের র্যালী যাত্রাবাড়িতে এই প্রথম। এটিই শেষ সুযোগ যাত্রাবাড়িবাসী!”
র্যালীটি ফিরে আসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করে দিলাম। স্ক্রিপ্টটি দেয়ার লোভ সামলাতে পারছিনা:
আমি: সুপ্রিয় দর্শক শ্রোতা, র্যালীর পর আবারো আপনাদেরকে “রঙ পেন্সিল একাডেমি”র বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে স্বাগতম। এখন আমাদের আয়োজনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করতে যাচ্ছি।
রুমি: হ্যাঁ, আর এই পর্বটি কিন্তু অনেক মজার!
আমি: কেমন?
রুমি: কারণ এখন অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আমরা এখন মজার মজার নাচ, গান ও নাটক উপভোগ করবো।
আমি: ওহ! রুমি, নাচ গান নাটক ছাড়াও তো আমাদের আরো আয়োজন আছে! সেগুলো বললে না যে!
রুমি: বলবো, তবে এখন না। আরোকটু অপেক্ষা করো।
আমি: আর কত অপেক্ষা করবো। শুরু করে দাও না।
রুমি: না, অপেক্ষা করতেই হবে!
আমি: [অভিমান করার ভান করে] ধ্যত! তোমার সঙ্গে আমি কোনো কথাই বলবো না।
রুমি: কথা বলবে না? রাগ করেছো? ঠিক আছে, তোমার মন ভাল করার জন্য আমি একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছি। নিশ্চয়ই তোমার মন ভাল হয়ে যাবে।
আমি: কি কবিতা শোনাতে চাও আমায়?
রুমি: কবিতাটি হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”।
আমি: ঠিক আছে, দেখা যাক কতটুকু মন ভাল করতে পারো। দর্শকবৃন্দ, আপনারাও শুনুন। আশা করি আপনাদেরও মন ভাল হয়ে যাবে।
[রুমি কবিতাটি আবৃত্তি করলো]
আমি: অনেক ধন্যবাদ রুমি, আমার মন একদম ভাল হয়ে গেছে। এত ভাল হয়ে গেছে যে এখন একটি গান শুনতে ইচ্ছে করছে।
রুমি: হ্যাঁ, আমারও একটি গান শুনতে ইচ্ছে করছে। এসো তাহলে একটি গান শোনা যাক। আর গানটি নিয়ে আসছে তুলসী।
অনুষ্ঠানটি ভালই চলছিল আমাদের উপস্থাপনায় – সবার চোখে মুখে মজা দেখতে পাচ্ছিলাম। (হ্যাঁ, মজা আবার দেখাও যায় – অন্তত রঙ পেন্সিল একাডেমির অনুষ্ঠানে, পরিচালক মহোদয় “পাম” পেয়েছেন কি?) মজা করতে করতে ম্যাজিক শোয়ের পালা এলো। অনেকগুলো ম্যাজিক দেখিয়ে শামীম ভাই আমাদেরকে আনন্দ দিলেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কাগজের টুকরা খেয়ে বড় কাগজ বের করা, টাকাকে কাগজে তারপর কাগজকে টাকায় রূপান্তর করা। তবে আমার পছন্দের জাদুটি ছিল এরকম –
একটি ফ্লানেল/চোঙ্গার নিচে আঙুল দিয়ে আঁটকে তাতে পানি ঢালা হল। তারপর এক ছোট ছেলেকে ভলান্টিয়ার হিসেবে আনা হল এবং তাকে পানিটা খেতে দেয়া হল। শামীম ভাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি পানিটা খাইছো কি দিয়া? কান দিয়া, নাক দিয়া, পেট দিয়া, নাকি মুখ দিয়া?” বাচ্চাটা বলতে পারছিলো না। সবাই তার অপ্রস্তুত ভাব দেখে হেসে দিলো। শামীম ভাইয়ের এ্যাসিস্টেন্ট বলে দিলো, “বলো, মুখ দিয়ে।” বাচ্চাটাও বললো, “মুখ দিয়ে।” তারপর শামীম ভাই বাচ্চাটার পেটে চোঙ্গাটি ঠেকালো আর বললো, “এখন একটু কাশো। একটু ঝাকি দেও।” দেখা গেল চোঙ্গার পাইপ দিয়ে পানি বের হচ্ছে! তারপর চোঙ্গাটি কানে রাখা হল। পানি পড়ে না। শামীম ভাই পরে বাচ্চাটার হাত টিউবওয়েলের মত উপরে নিচে নিতে থাকলো আর সঙ্গে সঙ্গে কান দিয়ে পানি বেরুলো! সবাই জাদুটা দেখে খুব মজা পেল।
এরমধ্যে রুমির আরেক বান্ধবী – সুক্তি – এসে পড়লো। পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই রুমি তার বান্ধবীদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ রেখেছিল। আমার মনে হয় রুমির সাহস বাড়াতে তার বান্ধবীরা তাকে অনেক সাহায্য করেছে। এত লোকের সামনে উপস্থাপনা করা তো চাট্টিখানি কথা নয়!
এরমধ্যে হয়ে গেল আরো কিছু গান-নাটক। আমাদের নাটক বিভাগ প্রথমবারের মত সবার সামনে একটি নাটক পরিবেশন করলো। সবশেষে এলো নাচের পালা। আমাদের ক্ষুদে দুই ছাত্রী এমন নাচ দেখালো যে আমাদের পরিচালক সাহেবও গিয়ে তাদের সাথে নাচা শুরু করে দিলো! নাচের প্রায় শেষ দিকে আমরা একটু চিন্তিত হলাম, কারণ যোহরের আজান শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে নাচ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল বলে রক্ষা।
নাচ শেষ হবার পর আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ইতি টানা হলো। তবে আজানের পর ব্যান্ডদলের শো হবে। কিন্তু আমার আর রুমির কাজ শেষ। স্টেজ ছাড়ার সময় আমি আর রুমি হ্যান্ড শেক করলাম। রুমি বললো, “অনেক ভাল লাগলো উপস্থাপনা করে।” আমি হাত না ছেড়ে বললাম, “সামনে আরো উপস্থাপনা একসাথে করবো।” রুমি মাথা নেড়ে সায় দিলো, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” আমরা পরে অফিস রুমে চলে গেলাম।
শিবলুদা আমাদেরকে হাসিমুখে অভিনন্দন জানালো, “কনগ্র্যাচুলেশনস, আপনাদের উপস্থাপনা খুব ভাল হয়েছে। আমি স্টেজের আশেপাশে সবসময় খেয়াল রেখেছি তো। খুবই ভাল হয়েছে।”
২টা ৭মিনিটে আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হলো। শিবলুদাকে আমাদের উপস্থাপনার রিহার্সাল করে দেখিয়েছিলাম অনুষ্ঠানের আগের দিন। রিহার্সাল শেষ হবার পর শিবলুদা বলেছিল, “প্রায় একমাস যাবত আমি রঙ পেন্সিলের পিছনে খাটতেছি। আমার বাসায় যে কত সমস্যা হইছে আপনার জানেন না। এখন এসব বলে কোনো লাভ নাই। আগামীকালকে আমাদের একটা অনুষ্ঠান আছে। আপনারা চেষ্টা করবেন আপনাদের জায়গা থেকে আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে। কোনোধরণের সমস্যা হলে, এনিটাইম, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি, এই অধম শিবলুদা, আপনাদেরকে যতটুকু পারি সাহায্য করবো… কেউ কিন্তু মোরগ বানায় না, আমরা মোরগ তৈরি করসি। এটার পিছনে কারণ আছে। শহরের মানুষ কোলাহলের মধ্যে যান্ত্রিক পরিবেশে থাকে। তারা যখন পহেলা বৈশাখে সকালে উঠে দেখবে একটা মোরগ যাইতেছে রাস্তা দিয়া, তাদের ফিলিংসটা কেমন হবে বুঝতে পারেন? এগুলা বুঝতে হবে। … স্ক্রিপ্ট কোনো বিষয় না। অনুষ্ঠানের ভাব বুঝলে এমনিতেই সব হবে। … আমি যে মোরগটা বানাইসি, এই মোরগটা দেইখা যদি পিচ্ছি পিচ্ছি পোলাপানগুলা দৌড়াইতে দৌড়াইতে না চিল্লায় – ওই মোরগ আইছে, মোরগ আইসে তাহলে আমি শিল্পী হিসেবে স্বার্থক নই … আমি শুধু চাই যে এখানে একটা অনুষ্ঠান হোক, একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকুক। সবাই আসুক, অনুষ্ঠানটা দেখুক। এবং যখন আমি দেখবো যে মানুষগুলা হাসিমুখে ফিরা যাইতেছে, আর বলতেছে ইস আরেকটু যদি বড় হইতো অনুষ্ঠানটা – তখনই আমি বুঝবো যে এই অনুষ্ঠান স্বার্থক, এই আয়োজন স্বার্থক, এই শিবলুদা স্বার্থক। তখন যদি আমি মারাও যাই তারপরও কোনো আফসোস থাকবে না। আমি বরং স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাবো। কারণ আমি একটা ভাল অনুষ্ঠান উপহার দিয়া পৃথিবী ত্যাগ করসি।” আমি মানুষের চেহারায় সেরকম একটা ভাব দেখতে পেলাম, শিবলুদা যেমনটা দেখতে চেয়েছিলেন। আমি যদিও লোকজনের মুখে অট্টহাসি দেখি নি! কিন্তু চেহারায় একটা তৃপ্তির ভাব দেখেছি। আমার সামনে দিয়ে দর্শকরা চলে যাওয়ার সময় কানে এলো, “অনুষ্ঠান খুব ভাল হইসে।”
অনুষ্ঠান শেষ হবার পর শিবলুদার কাছে গিয়ে আমি বললাম, “শিবলুদা, একটু আগে আপনি আমাকে কনগ্র্যাচুলেট করেছিলেন। এখন আপনাকে কনগ্র্যাচুলেট করছি। আপনার অনুষ্ঠান খুব ভাল হইসে।” শিবলুদা বললেন, “ধন্যবাদ দাদা, কিন্তু আমার কাছে মনে হইসে যে অনুষ্ঠানটা পুরা আমার মনের মত হয় নাই।” আমি বুঝলাম, শিবলুদার মত বড় মনের শিল্পী বলেই উনি এরকম একটা কথা বলতে পেরেছিলেন। আর স্টেজটা নিয়ে উনার আক্ষেপটা চেহারায় স্পষ্ট দেখতে পেলাম। স্টেজ নিয়ে দুর্ঘটনাটা না ঘটলে বোধহয় শিবলুদা আরো হাসিখুশি থাকতে পারতেন।
তারপর আমাদের ফটোসেশন হলো। সবাই বিশাল মোরগটার সাথে ছবি তুললাম। শিবলুদা মোরগের উপর শুয়ে একটা ছবি তুললেন।
আমি শিবলুদাকে বলে চলে যেতে চাইছিলাম। তিনি আমার হাত ধরে বললেন, “সে কি দাদা, আমরা এখন নাচবো তো। এরকমই তো কথা ছিল।” তারপর স্টেজে টেনে নিয়ে আমাকে নাচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন! কিছুক্ষণ থেকে আমি স্টেজ থেকে নেমে গেলাম আর অন্যদের নাচ দেখলাম। ভাবতে লাগলাম – শিবলুদাকে পেয়ে আমরা কত ভাগ্যবান। আর আমরা তরুণ হওয়াতে কত ভাগ্যবান। আমাদের কারো বয়সই ২৫-২৭-এর বেশি হবে না। অথচ আমরা রাস্তা বন্ধ করে অনুষ্ঠান করে ফেললাম, র্যালী করে ফেললাম, এমপি এনে ফেললাম। এমপির কথায় মনে পড়লো আমার পরিচালক বন্ধুটির কথা – যার নাম জীবন। সে যদি মানুষের কাছে গিয়ে গিয়ে ধন্যা না দিত তাহলে অনুষ্ঠানের কিছুই হত না। আর্থিক ব্যাপার তো আছেই তাছাড়া মানুষের সাথে যোগাযোগ, কাজ দেখাশোনা ইত্যাদি কাজে সে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। চেহারাটা তার দেখার মত হয়েছে। আমি এই লেখাটি যখন লিখছি তখনও ও বাসার বাইরে। অনুষ্ঠান করতে গিয়ে তাকে অনেক ধারদেনা করতে হয়েছে। এখনও বোধহয় সে সেগুলো ম্যানেজ করতে ব্যস্ত।
লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। ফাস্ট ফরওয়ার্ড করি। বাসায় এসে খেয়েদেয়ে একটু ঘুম দেয়ার চেষ্টা করছিলাম এমন সময় আমার বন্ধু মেহেদী এসে হাজির। ওকে আমি ফোন করে আসতে বলেছিলাম, কিন্তু পরে ওর কোনো রেসপন্স পাই নি। আমি তো রেগে মেগে গিয়েছিলাম। পরে ওই বললো, যে ও নাকি অনুষ্ঠানে গিয়েছিল এবং আমাদের উপস্থাপনা দেখেছে। ওর ভাষায় অনুষ্ঠানটা “জট্টিল হইসে”। আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার প্রথম কিছু অংশ সে দেখেছিল (যতটুকু স্ক্রিপ্ট এখানে দিলাম আরকি)। আমাদের দুজনের উপস্থাপনার খুব প্রশংসা করলো। সঙ্গে সঙ্গে আব্বার গিফট করা পাঞ্জাবীটার প্রশংসাও পেলাম। ও বললো, যে অনুষ্ঠানটার কারণে একাডেমির নাম অনেকদূর যাবে।
অনুষ্ঠান ছাড়াও অনেক কথা তার সঙ্গে হয়েছিল যেগুলো লিখে রাখার মত। কিন্তু লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে বলে আর লিখছি না। আমরা ছাদে গিয়ে অনেক মজার মজার আলাপ করেছিলাম (মেহেদী, আশা করি কথাগুলো তোমার মনে থাকবে – কারণ আমি লিখে রাখতে পারলাম না)।
অনুষ্ঠানটা ভালভাবে শেষ হয়েছে, তারপরও বাসায় ফেরার পর কেন যেন ভাল লাগছিল না। শিবলুদার “অতৃপ্তির” রোগে হয়তো আমাকেও পেয়ে বসেছিল! কিন্তু মেহেদীর সঙ্গে কথা বলে আমার মন ভাল হয়ে গেল।
তৃপ্তি-অতৃপ্তির ঢেউয়ের খেলায় দিনটি শেষ হয়ে গেল। কি আর বলবো, আমার চেনা-অচেনা মানুষদের কারণে নববর্ষটি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।